মাঈনউদ্দীন জিপু, বাউফল (পটুয়াখালী) 

পটুয়াখালী বাউফলের পান বিদেশে রপ্তানি না হওয়ায় পানের দাম কমে গেছে। বরজ তৈরীর কাঁচামালেরও দাম বেড়েছে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ৩জন স্ট্রোক করেছেন। মারা গেছেন দুইজন। এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন প্রায় ৩শত চাষী ও বারুই। 

সরেজমিনে জানাগেছে,  শত বছর ধরে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর বাউফল একসময় পরিচিত ছিল সবুজ পান–বরজের জনপদ হিসেবে। উপজেলার বিলবিলাস গোসিংগা ও মদনপুরা গ্রামগুলো ছিলো পানের জন্য বিখ্যাত। পান চাষের উপর ভিত্তি করে শতবছর আগে সদর উপজেলার  বিলবিলাস হাটে জমে উঠে পান বিক্রির পাইকারি বাজার। শতাব্দী পর শতাব্দী চলে আসছে এই পান বাজার। ফজরের আজানের পর পরই বরজ মালিকরা পান নিয়ে আসেন বিলবিলাস বাজারে। জেলা বিভাগের পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতারা দ্রুত সময়ে কিনে নিয়ে ফিরেন গন্তব্যে। সকাল ৮টার মধ্যেই অর্থাৎ দুই ঘন্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় এই বাজার। 

উপজেলার গ্রামগুলোর সারি সারি বরজই বলে দিতো একসময়ে গ্রামের আর্থিক ভিত কতটা মজবুত ছিল পান চাষের ওপর। শতাব্দী পূর্ব থেকেই হিন্দু বরজ মালিকরা এই পান চাষ করে আসছেন।  দেশ ভাগের পরে হিন্দুরা এসব বরজ ফেলে গেলে তাদের বরজে কাজ করা মুসলিম চাষীরা (বারুই) এই বরজ স্বল্প মূল্যে কিনে পুনরায় পান চাষে ফিরেন। উপজেলায় ৩১০জন পান চাষি থাকলেও তাদের বরজে বারুই রয়েছে প্রায় দুই সহস্রাধিক। 

বাউফলের মদনপুরা, নাজিরপুর, কালাইয়া, চন্দ্রদ্বীপসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে প্রতিদিনই পান যেত বরিশাল ও ঢাকার পাইকারি বাজারে।

একসময় উর্বর মাটি, অনুকূল আবহাওয়া ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে পান ছিল বাউফলের সবচেয়ে লাভজনক ফসল। সংসার চালানো থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার ব্যয় সবকিছুতেই কৃষকদের একমাত্র ভরসা ছিল পান। কিন্তু সেই স্বর্ণযুগ এখন কেবলই স্মৃতি। রোগবালাই, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, বাজারদরের অনিশ্চয়তা ও শ্রমিক সংকট মিলিয়ে পান চাষ কমতে কমতে এখন নেমে এসেছে মাত্র  ২৫ হেক্টর জমিতে।

বরজ তৈরি করতে কাঠ, বাঁশ, খুঁটি, শ্রমিকসহ খরচ পড়ছে ৫০–৬০ হাজার টাকা। অথচ আয় মাত্র ২০ হাজার টাকা। সামান্য বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতায় বরজে দ্রুত পচন ধরে যায়। ফলে অনেক চাষি বরজ তুলে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

বাজার ব্যবস্থায় চরম দুরবস্থা, নেই কোনো স্থায়ী পান সংগ্রহকেন্দ্র। স্থানীয় বাজারে দালালদের নিয়ন্ত্রণে চাষিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর ঢাকাসহ বড় পাইকারি বাজারে পাঠালেও পরিবহন ব্যয় কেটে যাওয়ায় লাভের বড় অংশ কমে যায়।

রোগবালাই দমনে চাষিরা নিয়মিতই ক্ষতিকর সালমোনেলা salmonella ব্যাকটোরিয়া থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি মাটির গুণগত মান কমছে এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।

কিন্তু সকল ধরনের ফসল চাষে কৃষকরা প্রণোদনার সুযোগ পেলেও শত বছরের পুরনো পান চাষীদের জন্য নেই কোন প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ।  যে কারনে শত বছরের পেশা ও পান চাষ ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবার পথে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, পানের রোগ ধরা পড়ায় পান বিদেশে রপ্তানি হচ্ছেনা। সকল কাঁচামালের দাম বেড়েছে। যে কারনে অনেকে ব্যবসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে ঋণের চাপে। 

বাঙ্গালি সমাজের রীতিতে মেহমানের কাছে পান না দিলে মান বর্জায় থাকতো না৷ যা এখনও গ্রামীন সমাজে বহমান। স্থানীয়রা মনে করছেন ইতিহাসের ঐতিহ্য ও মান ধরে রাখতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

পান চাষের বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার, মিলন মিয়া বলেন, বিমান বন্দর প্লান্ট কোয়ারান্টাইন স্টেশনে পরীক্ষা করে পান বিদেশে রপ্তানি হতো। সালমোনেলা নামের ভাইরাস ধরা পড়ায় বিদেশে রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। পান চাষে সরকারিভাবে কোন প্রণোদনা দেওয়া হয় না। তবে কৃষকদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।


বিজ্ঞাপন
Advertisement