বাবুগঞ্জ প্রতিনিধি
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনটি বিএনপির কাছে দীর্ঘদিন ধরেই ‘নিজেদের আসন’ হিসেবে পরিচিত। তবে শক্ত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও ২০০৮ সালের পর থেকে নানা রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধানের শীষ এ আসনে জয় পায়নি। এবার দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে চায় দলটি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন—বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী এবি পার্টির ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ফুয়াদ, জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের ইয়ামিন এইচ এম ফারদিন এবং বাসদের আজমুল হাসান জিহাদ। বিএনপি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও ভোটের লড়াই সহজ হবে না বলে মনে করছেন রাজনীতি সচেতন ভোটাররা।
ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে বরিশাল-৩ আসনটি জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এখানে রয়েছে বরিশাল বিমানবন্দর, ক্যাডেট কলেজ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) বহিঃক্যাম্পাস, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ও ইনস্টিটিউটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ব্যাপক জনসমর্থনের কারণে একে ধানের শীষের আসন হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। যদিও সর্বশেষ ২০০১ সালে বিএনপি এখানে জয়লাভ করে। পরবর্তীতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ, নির্বাচন বর্জন ও ভোট কারচুপির অভিযোগের কারণে দলটি আর বিজয়ী হতে পারেনি। ২০০৮ সালে পরাজয়ের পর ২০১৪ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ২০১৮ সালে অংশ নিলেও অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন। এবার বিপুল ভোটে তিনি জয়ী হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন নেতাকর্মীরা। ১৮ বছর পর আসন পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশায় রয়েছে বিএনপি।
বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘বরিশাল-৩ আসন ধানের শীষের ঘাঁটি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময়েও জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু ফল পাল্টে দিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এবার বাবুগঞ্জ-মুলাদীর মানুষ আমাকে বিপুল ভোটে জয়ী করবে।’
এ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী ব্যারিস্টার ফুয়াদ এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক। তিনি ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অর্জিত পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। জোটভুক্ত দলগুলোর নেতাকর্মীদের সমর্থনও পাচ্ছেন। পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। যারা ভোট দেবে আর যারা দেবে না—নির্বাচিত হলে সবার এমপি হতে চাই।’
কারাগারে থেকেই লড়াইয়ে টিপু: জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু এ আসনের তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী একাধিক মামলায় বর্তমানে তিনি কারাবন্দি। কারাগারে থেকেই এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তিনি ২০০৮, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে জয়ী হন। জাতীয় পার্টির বড় ভোটব্যাংক না থাকলেও বারবার এমপি হওয়ার সুবাদে টিপুর নিজস্ব সমর্থকবলয় তৈরি হয়েছে। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের ধারণা, আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গেলে টিপুকেই সমর্থন দেবেন। সে ক্ষেত্রে আবারও জাতীয় পার্টির জয় হতে পারে বলে তারা আশাবাদী।
হাতপাখারও রয়েছে ভোটব্যাংক: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ আসনে কখনোই জয়ের খুব কাছাকাছি যেতে পারেনি। তবে বাবুগঞ্জ-মুলাদী এলাকায় তাদের প্রায় ২০ হাজার কর্মীর একটি রিজার্ভ ভোটব্যাংক রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোটের দিন দুপুরে নির্বাচন বর্জনের পরও প্রায় ১৪ হাজার ভোট পেয়েছিলেন ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক উপাধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। এবারও তিনি হাতপাখা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি সুবক্তা হিসেবে ওয়াজ-মাহফিলে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে।