কীর্তনখোলা রিপোর্ট

কবি জীবনানন্দ দাশের জন্মভূমি বরিশাল একসময় সবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। সড়কের দুপাশে সারিবদ্ধ গাছ আর সেগুলোর গায়ে জড়িয়ে থাকা পরজীবী লতা—সবই এখন অনেকাংশে স্মৃতির অংশ। তবু এখনো কিছু জায়গায় বসন্তের আগমনে বাগানবিলাস ও কৃষ্ণচূড়ার থোকা থোকা ফুলে শহর হঠাৎ প্রাণ ফিরে পায়। শুক্রবার দুপুরে নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হাঁটলে চোখে পড়ে রঙের সমারোহ। বাগানবিলাসসহ বিভিন্ন ফুলের বাহার যেন মুহূর্তেই শহরকে ভিন্ন এক আবহে রাঙিয়ে তোলে। সিঅ্যান্ডবি সড়ক, কবি জীবনানন্দ দাশ সড়ক (বগুড়া সড়ক), ক্লাব রোড ও রাজাবাহাদুর সড়কের পাশের বাড়ির ফটক এবং সড়ক বিভাজকে গাছের ডালে ডালে রঙিন বাগানবিলাস দোল খাচ্ছে। দুপুরের রোদে ফুলগুলো এমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল যে পথচারীদের চোখ অনায়াসেই সেখানে আটকে যাচ্ছিল। কবি জীবনানন্দ দাশ সড়ক ও ক্লাব রোডের দুটি পুরোনো বাড়ির প্রধান ফটকেও একই চিত্র দেখা যায়। লোহার গেট জড়িয়ে থাকা ফুল যেন নিজস্ব আয়োজনে উৎসব সাজিয়েছে। রাজাবাহাদুর সড়ক ধরে এগোলে সড়ক বিভাজকের ছোট গাছগুলোতেও থোকা থোকা বাগানবিলাস চোখে পড়ে। মনে হয়, শহরের মাঝখানে বসন্তের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদীপ জ্বলছে। নগরের সিঅ্যান্ডবি সড়কে বিএডিসি ভবনের সামনের দেয়ালসংলগ্ন স্থানজুড়ে যেন বাগানবিলাসের ছোট্ট আয়োজন বসেছে। সরু ডালে ঝুলে থাকা রঙিন ফুল দেয়ালটিকে রঙিন আবরণে ঢেকে দিয়েছে। সেখানে ভিড় করছেন তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরীরা। কেউ ছবি তুলছে, কেউ নীরবে ফুলের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাচ্ছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও দেয়ালঘেঁষা সেই কোণটি যেন হয়ে উঠেছে বসন্তের এক টুকরো আশ্রয়। মাটিতে ছড়িয়ে থাকা পাপড়ি বসন্তের কারুকাজের মতো দেখাচ্ছিল। কীর্তনখোলা নদীতীরের মুক্তিযোদ্ধা পার্কের প্রবেশমুখে পৌঁছালে দৃশ্য আরও গাঢ় হয়। দুপাশে সারিবদ্ধ ঝাউগাছের ছায়া অতিক্রম করে মূল ফটকে রঙিন বাগানবিলাস আগত দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। ভেতরে সারি সারি বোতলব্রাশগাছের শাখায় ঝুলে থাকা লাল ফুলের ঝাড় বিশেষ মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছে। গাছের ছায়ায় থাকা বেঞ্চগুলোতে বসে তরুণ-তরুণীরা উপভোগ করছেন প্রকৃতির এ রূপ। কেউ ধীরে আলাপ করছেন, কেউ দূরে তাকিয়ে ভাবনায় ডুবে আছেন। যেন স্মৃতির ভাঁজে জমা রাখছেন এই মুহূর্তগুলো। সামনে শান্ত কীর্তনখোলা নদীর ধীর স্রোত। ছোট ছোট জেলেনৌকা জাল গুটিয়ে তীরে ফিরছে, আর বন্দর থেকে যাত্রী নিয়ে একতলা ছোট লঞ্চ গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে। বসন্তের দুপুরে পার্কের বেঞ্চে বসে এই দৃশ্য উপভোগ করছিলেন ইকবাল হোসেন ও মেহেদী হাসান নামের দুই বন্ধু। মেহেদী হাসান বলেন, ‘নগরায়ণের চাপে এখন ঋতুর স্বাভাবিক সৌন্দর্য আমরা আগের মতো অনুভব করতে পারি না। বসন্ত এলে ফুলে ফুলে সেজে প্রকৃতি যে আলাদা পরিবেশ তৈরি করে, তা মানুষের মনেও রং ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু শহুরে ব্যস্ততায় সেই অনুভূতির সুযোগ কমে গেছে। তাই কিছুটা স্বস্তি খুঁজতেই এখানে আসা।’ গোলাপি, লাল, বেগুনি, সাদা, হলুদ ও কমলা—নানান রঙের বাগানবিলাসে এই বসন্তে বরিশাল যেন নতুন সাজে সেজেছে। মানুষ বদলায়, শহরও বদলায়; তবু ঋতুচক্র তার নিয়মে ফিরে আসে। আর বসন্ত এলে জীবনানন্দের শহর আবার কবিতার মতো রূপ ধারণ করে।

বিজ্ঞাপন
Advertisement