উজিরপুর প্রতিনিধি
নির্মাণের দুই দশক পরও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীতে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে চলেছে বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্স, যা দক্ষিণাঞ্চলে ‘গুঠিয়া মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত। প্রাতিষ্ঠানিক নাম বায়তুল আমান জামে মসজিদ হলেও স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এটি গুঠিয়া মসজিদ হিসেবেই সুপরিচিত। বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ও নান্দনিক মসজিদগুলোর মধ্যে বরিশালের এই মসজিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি এশিয়ার বৃহৎ জামে মসজিদগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
সন্ধ্যার পর মসজিদটির সৌন্দর্য আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ভবনের শোভা বাড়াতে বর্ণিল আলোকসজ্জা, বিভিন্ন স্থানে রঙিন কাচ, দামী মার্বেল পাথর, গ্রানাইট ও সিরামিকের নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। সারা বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষ এখানে ভিড় করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মসজিদটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।
মসজিদটি বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত। বরিশাল শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। প্রায় ১৪ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই সুবিশাল কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়েছে। বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে প্রাঙ্গণে ঘুরছেন এবং ছবি তুলছেন।
বরিশাল নগরী থেকে ঘুরতে আসা আমিনুল সোহেল বলেন, আগে বহুবার এসেছেন, তবুও সুযোগ পেলেই আসেন। মসজিদের সৌন্দর্য তাকে টানে। তিনি জানান, বিকেলে দুর্গা সাগর দিঘি ঘুরে দেখে সন্ধ্যায় এখানে এসেছেন, কারণ আলোকসজ্জায় সন্ধ্যায় মসজিদের আসল রূপ ফুটে ওঠে।
আগৈলঝাড়া থেকে পরিবার নিয়ে আসা নাজমুল রিপন বলেন, দীর্ঘদিনের ইচ্ছা পূরণ করতে পরিবারসহ এসেছেন। তাঁর মতে, মসজিদটি সত্যিই দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ। রাতের আলোকসজ্জায় নান্দনিক কারুকাজ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন।
মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে ডান পাশে একটি পুকুর দেখা যায়। চারপাশে রঙিন ফুল ও গাছের সমাহার রয়েছে। দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধার্থে পুকুরপাড়ের রাস্তা পাকা করা হয়েছে। দক্ষিণ পাশে রয়েছে প্রায় ১৯৩ ফুট উঁচু একটি মিনার। পুরো কমপ্লেক্সজুড়ে ছোট-বড় ৯টি গম্বুজ রয়েছে। ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে আয়াতুল কুরসি, সুরা আর রহমানসহ পবিত্র কোরআনের নানা আয়াত লেখা আছে। এখানে কাবা শরীফ, আরাফার ময়দান, জাবালে রহমত, জাবালে নূর, নবীজির জন্মস্থান, মা হাওয়ার কবরস্থান ও খলিফাদের কবরস্থানসহ মক্কা-মদিনার বিভিন্ন স্থানের মাটি সংরক্ষিত রয়েছে।
শিলালিপি থেকে জানা যায়, বরিশাল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা। ২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০০৬ সালে তা সম্পন্ন হয়। প্রায় ১৪ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্স নির্মাণে ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ২০ কোটি টাকা। তিন বছর ধরে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার শ্রমিক নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন। ২০টি গম্বুজের নকশায় মসজিদটি সাজানো হয়েছে।
এ ছাড়া কমপ্লেক্সে রয়েছে ডাকবাংলো, এতিমখানা, গাড়ি পার্কিং, পুকুর, লেক ও বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের বাগান। একটি হেলিপ্যাডও রয়েছে। একসঙ্গে প্রায় ১,৫০০ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি ২০ হাজারের বেশি ধারণক্ষমতার ঈদগাহ ময়দানও আছে।
দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি ও নকশাদার আলোকবাতি মসজিদের অভ্যন্তরকে আলোকিত করে। বাইরে ঈদগাহ কমপ্লেক্সজুড়েও রয়েছে বাহারি আলোকসজ্জা, যা রাতে মসজিদের শোভা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মসজিদের তিন পাশে কৃত্রিম লেক খনন করা হয়েছে।
জানা যায়, প্রতিষ্ঠাতা সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু কয়েকজন স্থপতি বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে দুবাই, তুরস্ক, মদিনা শরীফ, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে সেখানকার মসজিদগুলোর স্থাপত্যশৈলী পরিদর্শন করেন এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে গুঠিয়ায় মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের সামনের পুকুর এমনভাবে খনন করা হয়েছে, যাতে পানিতে পুরো ভবনের প্রতিবিম্ব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে বাস বা মাহিন্দ্রায় করে প্রায় আধাঘণ্টায় পৌঁছানো যায় গুঠিয়া মসজিদে। বরিশাল-বানারিপাড়া আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় যানবাহন থেকে নামলেই মসজিদটি চোখে পড়ে। সন্ধ্যার সময় ভ্রমণের জন্য স্থানটি বিশেষ উপযোগী, কারণ রাতের আলোকসজ্জায় মসজিদের সৌন্দর্য আরও উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পায়।