হাফিজুর রহমান হিমেল
একুশ মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠা এক টুকরো রক্তমাখা জামা। সেই জামা, যা বহন করছিল ভাষা আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোর ইতিহাস। আর সেই জামার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক দৃঢ়চেতা মানুষের নাম—ভাষা সৈনিক সৈয়দ আশরাফ হোসেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে যখন গুলির শব্দে কেঁপে উঠেছিল আকাশ—বাতাস, তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন আব্দুস সালাম। আহত সালামকে বহন করে যখন মেডিকেলে নেওয়া হলো, তাঁর ধবধবে সাদা জামা লাল রক্তে ভিজে উঠল—যেন ভাষার অধিকারের অগ্নিসাক্ষর। সেই রক্তমাখা জামাটি হাতে তুলে নিয়েছিলেন সৈয়দ আশরাফ হোসেন। পরে তিনি সেই জামা নিয়ে ফিরে আসেন পটুয়াখালীতে—একটি জামা, যা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রতীক।
তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—এর এম.কম শেষ বর্ষের ছাত্র। ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি যুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ তোহা, অলি আহাদ, গাজীউল হক, এবিএম আবদুল লতিফ—সহ বহু নেতৃত্বের সঙ্গে। তিনি বলতেন, আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল ঢাকা হল (এক্সটেনশন)। ১৪৪ ধারা জারির পরও ছাত্রদের সিদ্ধান্ত ছিল অটল—বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।
সেদিন মিছিলের অগ্রভাগে ছিল মেয়েরা—তাদের দৃপ্ত পদচারণায় রাজপথ কেঁপে উঠেছিল; পরে ছেলেরাও সেই স্রোতে এসে মিলিত হয়। কেউ ভাবতেও পারেনি শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালাবে। মেডিকেল কলেজের কাছে গুলির শব্দ শোনা যায়। প্রথমে অনেকে মনে করেছিলেন ফাঁকা গুলি। কিন্তু আব্দুস সালাম মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বাস্তবতা নির্মম হয়ে ওঠে। সৈয়দ আশরাফসহ কয়েকজন তাঁকে মেডিকেলে নিয়ে যান। এরপর দীর্ঘ দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ৭ এপ্রিল, ১৯৫২ তারিখে সালাম শহীদের কাতারে শামিল হন।
পটুয়াখালীতে ফিরে তিনি যে কাজটি করেছিলেন, সেটিই তাঁকে এই জনপদের ইতিহাসে আলাদা মর্যাদা দেয়। আদালতপাড়ার বড় মসজিদের পাশের মাঠে আয়োজিত প্রথম রাষ্ট্রভাষা জনসভায় তিনি জনতার সামনে তুলে ধরেন সালামের রক্তমাখা জামা। মুহূর্তেই জনতা স্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর ক্ষোভে ফেটে পড়ে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে জুবিলী স্কুল মাঠে ডাকা হয় গণসমাবেশ। স্মরণকালের বৃহত্তম জনসমাগম ঘটে সেখানে। দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন থাকলেও জনতার ঢল থামেনি। স্বতঃস্ফূর্ত হরতালে থমকে যায় শহর।
সৈয়দ আশরাফ হোসেন ছিলেন নির্লোভ, নীরব কিন্তু দৃঢ়চেতা রাজনীতিক। ১৯২৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধূলিয়া ইউনিয়নে তাঁর জন্ম। পিতা সৈয়দ আছমত আলী ছিলেন কৃষিজীবী। এম.কম সম্পন্ন করে চাকরিতে যোগ দিলেও তাতে তাঁর মন টেকেনি। ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানী—এর আহ্বানে কাগমারী সম্মেলনে অংশ নিয়ে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। আদর্শের প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি।
জীবনের শেষ পর্বে একটি রিকশা দুর্ঘটনায় কোমরে গুরুতর আঘাত পান। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও পুরোপুরি সুস্থ হননি। চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়ে। তবু তাঁর মানসিক দৃঢ়তা ছিল অটুট। বই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
২০০৮ সালের ৩ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বিদায়ে পটুয়াখালী হারায় এক নীরব প্রহরীকে—যিনি ইতিহাসের এক টুকরো রক্তাক্ত স্মৃতি বুকে নিয়ে সারাজীবন বেঁচে ছিলেন। আজ তিনি নেই, কিন্তু একুশ এলে মনে পড়ে সেই রক্তমাখা জামার কথা, মনে পড়ে তাঁর দৃঢ় কণ্ঠের কথা। ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক জীবন্ত সাক্ষী—একুশের রক্তসাক্ষী।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ তাঁর সমাধি ধূলিয়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। যে মানুষটি একুশের রক্তমাখা জামা বুকে নিয়ে জনপদকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, তাঁর কবরটিই আজ অবহেলার সাক্ষী। ইতিহাসকে ধারণ করা সেই মানুষটির স্মৃতিচিহ্ন যেন নীরবে প্রশ্ন তোলে—আমরা কি আমাদের আত্মত্যাগীদের যথার্থ সম্মান দিতে পেরেছি?
একুশ এলে আমরা শহীদদের স্মরণ করি, শপথ নিই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার। কিন্তু সেই শপথের অংশ হওয়া উচিত তাঁদের স্মৃতির সংরক্ষণও। সৈয়দ আশরাফ হোসেন ছিলেন একুশের জীবন্ত সাক্ষী—আর তাঁর সমাধি যেন আমাদের দায়িত্ববোধের আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।