কীর্তনখোলা ডেস্ক

আজ শনিবার, ৮ ফাল্গুন—অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে শহীদ হন আব্দুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমেদ, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত, শফিউর রহমানসহ আরও অনেকে। মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য প্রাণ বিসর্জনের এমন দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। গৌরবময় এই দিনটি আজ বাঙালি জাতিসহ বিশ্বের নানা দেশের মানুষ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে।

প্রয়াত ভাষাসৈনিক ও লেখক আহমদ রফিক তাঁর ‘ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থে একুশে ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যার বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার সময়টি শাসকদের জন্য যেন কালবেলার মতো হয়ে উঠেছিল—পরিবেশ ও ঘটনার তাৎপর্যে। মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছুটে আসা মানুষের পদধূলি আর কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ার অবশিষ্ট মিলে এক ভিন্নতর আবহ তৈরি করেছিল। ছাত্র-জনতার শোক ও কান্না শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে এক ধরনের ঘৃণা ও শক্তির সঞ্চার করে, যা আন্দোলনের জন্য বিস্ফোরক পুঁজিতে পরিণত হয়।’

১৪৪ ধারা ভঙ্গের মাধ্যমে শুরু হওয়া একুশের সকাল গুলিবর্ষণ, রক্তপাত ও মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে সন্ধ্যায় শাসকদের জন্য কালসময়ে রূপ নেয়। আজ একুশ কেবল বাঙালির নয়; বাংলাদেশ বা বাংলা ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের সব জাতি ও ভাষাভাষীর কাছে এটি এক অমর ও অক্ষয় চেতনার প্রতীক।

দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অমর একুশের চেতনা অফুরন্ত প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় একুশের চেতনা এক অনির্বাণ উৎস। ভাষা একটি জাতির অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান বাহক ও ধারক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি; এটি বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল শিক্ষা। তিনি বলেন, এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ অতিক্রম করে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এ অগ্রযাত্রা সুসংহত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভাষা শহীদ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সব শহীদের স্বপ্ন ধারণ করে একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ভাষার ওপর এই আঘাত থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় বাঙালির ভাষাভিত্তিক চেতনা, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এবং জাতীয়তাবাদের উন্মেষ।

এই সংগ্রাম চূড়ান্ত রূপ পায় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলা। আন্দোলন দমনে ঢাকা শহরে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। তা অমান্য করে ২১ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের নিকটবর্তী স্থানে তাদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ করা হয়। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে পরবর্তীতে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই এ অঞ্চলের মানুষকে পথ দেখায়। পরবর্তী দুই দশকে একের পর এক আন্দোলন স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়। দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়, বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

প্রথমদিকে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পরিচিত থাকলেও পরে এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

মাতৃভাষা ও ভাষা শহীদদের স্মরণে আজ জাতি শ্রদ্ধায় অবনত হবে। প্রভাতফেরিতে ধ্বনিত হবে সেই চিরচেনা সুর—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’। ফুলেল শ্রদ্ধায় ভরে উঠবে শহীদ মিনার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল আয়োজনের পাশাপাশি সারা দেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হবে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি উদযাপনে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ ভাষা শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানাবে। বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। একুশের প্রভাতে কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রভাতফেরি অনুষ্ঠিত হবে এবং আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন সর্বস্তরের মানুষ।

দিবসটি উপলক্ষে আজ সাধারণ ছুটি। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। ভাষা শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে। দেশের সব মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হবে। সংবাদপত্রগুলোও বিশেষ আয়োজন প্রকাশ করবে।

অমর একুশে বক্তৃতার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। সকাল ১১টায় একাডেমির নজরুল মঞ্চে বক্তব্য দেবেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম এবং সভাপতিত্ব করবেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এর আগে সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত নজরুল মঞ্চে কবি আবদুল হাই শিকদারর সভাপতিত্বে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর অনুষ্ঠিত হবে। ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটও বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় ছায়ানট মিলনায়তনে একক ও সম্মেলক সংগীত এবং পাঠ-আবৃত্তির আয়োজন থাকবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বাংলা ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং বিদেশি ভাষার কবিতা পাঠ ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।

বিজ্ঞাপন
Advertisement