কীর্তনখোলা রিপোর্ট

একসময় দেশে ইলিশ মাছ উৎপাদনের দিক দিয়ে প্রধান কেন্দ্র ছিল বরিশালাঞ্চলসেই বরিশাল বিভাগে কমেছে ইলিশের উৎপাদনউৎপাদন কমার এই ধারাবাহিকতার কয়েক বছর ধরে অব্যাহত রয়েছেচলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভরা মৌসুমেও অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশআর এই কারণে হতাশ হয়ে পড়ছেন জেলে-আড়তদার ও ব্যবসায়ীরাএর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন জেলেরা

 এদিকে নদ-নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ না ধরা পড়ার প্রভাব পড়েছে বাজারেসরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ইলিশের দাম নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছেফলে বাজারে পছন্দের ইলিশ কিনতে গিয়ে তাদের হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছেমৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিলএরপর টানা তিন বছর উৎপাদন কমেছে

২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টন২০২৪-২৫ অর্থবছরের তা এসে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টনেচলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে আসে ২ লাখ ২১ হাজার ৫৪৫ টনেঅর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৩৮ টনউৎপাদন কমার প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছেভরা মৌসুমেও বরিশালের বাজারে ইলিশের সংকট দেখা দিয়েছেঅভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ মিলছে নাফলে এক সপ্তাহ ধরে বাজারে ইলিশের সরবরাহ প্রায় তলানিতে নেমে এসেছে

বরিশাল নগরের পোর্ট রোডের ইলিশ মোকাম ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি আড়তে অল্প কিছু ইলিশ সাজানো থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই সাগর থেকে আগে ধরাঅর্থাৎ সাগরের মাছ দিয়েই কোনোমতে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরামেসার্স আক্তার ফিশ সাপ্লায়ার্সের স্বত্বাধিকারী মাসুম মৃধা বলেন, ঈদের পর থেকে বাজারে ইলিশের সরবরাহ একেবারেই কমে গেছেস্থানীয় নদী থেকে দুই-তিন মণের বেশি মাছ আসছে নাচাহিদার তুলনায় এটি খুবই সামান্যআর সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়ে গেছে ইলিশের দামবরিশালের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ টাকা ধরেআর ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৬০০ টাকায়, সাড়ে ৭০০ গ্রাম ওজনের ২ হাজার টাকায় এবং এক কেজি ওজনের ইলিশের বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্তব্যবসায়ীদের দাবি, ইলিশ সংকটের অন্যতম কারণ জাটকা নিধন

তাদের অভিযোগ, মেঘনা নদীসংলগ্ন হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এলাকায় এখনো অবাধে কারেন্ট জাল দিয়ে জাটকা ধরা হচ্ছেব্যবসায়ী মো. সুজন বলেন, ‘জাটকা রক্ষায় কঠোর অভিযান ছাড়া ইলিশ বাঁচানো সম্ভব নয়প্রজনন ও বেড়ে ওঠার সময় মাছ রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়বেমাছ না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলেরাহিজলা উপজেলার অরাকুল গ্রামের জেলে আরিফ বলেন, ‘সারা দিন নদীতে জাল ফেলেও মাছ পাই নাতেলের খরচই ওঠে নাএমন অবস্থা আগে দেখিনিমেহেন্দীগঞ্জ ও ভোলার জেলেরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেনতাদের ভাষ্য, নদীতে মাছের উপস্থিতি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. কামরুল হাসান বলেন, অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে অস্বাভাবিকভাবে ইলিশের উপস্থিতি কমে গেছেনদীর প্রবেশপথে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় সাগর থেকে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছেমৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মোহাম্মদ আনিছুর রহমানের মতে, নদীতে পলি জমা, নাব্যসংকট, চর ও ডুবোচর সৃষ্টি, জাটকা নিধন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদীদূষণসব মিলিয়ে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেমৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনাপ্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, নদ-নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় অনেক ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছেফলে তাদের বৃদ্ধি ও প্রজনন প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেএকই সঙ্গে অগভীর সাগরে ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করে ছোট আকারের মাছ ধরার প্রবণতাও বাড়ছে

মৎস্যবিজ্ঞানী আবদুল ওহাব মনে করেন, দক্ষিণাঞ্চলের বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদকে ঘিরে নতুন অভয়াশ্রম গঠন, নদীর মোহনা থেকে চর অপসারণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরিতিনি বলেন, ‘শুধু আইন প্রয়োগ করে জাটকা নিধন বন্ধ করা সম্ভব নয়নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের বিকল্প জীবিকা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবেএকই সঙ্গে পুরো নদীব্যবস্থার নাব্য, ডুবোচর ও দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে সমন্বিত জরিপ প্রয়োজনদক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য খাত, জেলে সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষা এবং জীবিকা উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশনের প্রকল্প সমন্বয়কারী জহিরুল ইসলাম বলেন, এই অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবিকা ইলিশনির্ভরউৎপাদন কমে যাওয়ায় শুধু জেলেরা নন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আড়তদার, ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যরাইলিশের উৎপাদন বাড়াতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে সংকট আরও গভীর হতে পারেএর প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতি ও উপকূলীয় জনজীবনে

বিজ্ঞাপন
Advertisement