কীর্তনখোলা ডেস্ক

দূরত্ব প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের। একদিকে সিডনি, অন্যদিকে পার্থ। ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে বসে যখন চীন ও উত্তর কোরিয়ার গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াই দেখছিলাম, তখন বারবার চোখ আটকে যাচ্ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। সেখানে ভেসে উঠছিল পার্থে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বনাম উজবেকিস্তান ম্যাচের দৃশ্য। এই একটি ম্যাচের ওপরই নির্ভর করছিল বাংলাদেশের ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন। প্রথমবারের মতো নারী এশিয়ান কাপের মূল পর্বে অংশ নেওয়া মনিকা-মারিয়াদের সামনে সমীকরণটি ছিল কঠিন—উজবেকিস্তানকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে সেরা দুই তৃতীয় দলের একটি হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। স্বপ্নটি ছিল দুঃসাহসী, কিন্তু অসম্ভব ছিল না। দলের ভেতরেও সেই বিশ্বাস ছিল। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারল না। পার্থের মাঠে তিন পরিবর্তন নিয়ে নামা বাংলাদেশ উজবেকিস্তানের কাছে ৪-০ গোলে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ১২ দলের এই টুর্নামেন্টে সবার আগে বিদায়ঘণ্টা বাজে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের গ্রুপ থেকে তৃতীয় হয়ে টুর্নামেন্টে টিকে থাকে উজবেকিস্তান। তবে তারা শেষ আটে উঠতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে ‘সি’ গ্রুপের শেষ দিনের ম্যাচ—ভিয়েতনাম বনাম জাপান এবং ভারত বনাম চাইনিজ তাইপে—এই দুই ম্যাচের ফলাফলের ওপর। সিডনির মাঠে অবশ্য ভিন্ন দৃশ্য দেখা গেছে। পিছিয়ে পড়েও উত্তর কোরিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চীন। স্টেডিয়ামে যখন উচ্ছ্বাসের ঢেউ, তখন সিডনির প্রেসবক্সে বসে থাকা বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের মনে ভর করেছিল বিষণ্নতা। উজবেকিস্তান ম্যাচটিকেই টুর্নামেন্টের শুরু থেকে ‘পাখির চোখ’ করে রেখেছিল বাংলাদেশ। র‌্যাঙ্কিংয়ে উজবেকিস্তান ৬৩ ধাপ এগিয়ে থাকলেও বিশ্বাস ছিল তাদের হারানো সম্ভব, অন্তত একটি ড্র পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পার্থের মাঠে সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়। প্রথমবার এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করাটাই ছিল দেশের ফুটবলের জন্য বড় প্রাপ্তি। দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার বড় মঞ্চে জায়গা করে নেওয়া ছিল ইতিহাসের প্রথম ধাপ। তবু প্রত্যাশা ছিল বড় কোনো চমক দেখানোর। এশীয় ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিযোগিতা যে কতটা কঠিন, তা ভালোভাবেই টের পেয়েছেন পিটার বাটলারের শিষ্যরা। প্রথম ম্যাচে নয়বারের চ্যাম্পিয়ন চীনের কাছে ২-০ গোলে লড়াকু হার, এরপর উত্তর কোরিয়ার কাছে ৫-০ গোলে পরাজয়। তবুও আশা ছিল শেষ ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর। কিন্তু উজবেকিস্তানের অভিজ্ঞতা ও শারীরিক সক্ষমতার সামনে টিকতে পারেনি বাংলাদেশ। ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে উজবেকিস্তান। ম্যাচের ১০ মিনিটেই গোল করে দলকে এগিয়ে দেন দিয়োরাখোন খাবিবুল্লায়েভা। গোল হজম করার পর বাংলাদেশ কিছুটা ছন্দে ফেরার চেষ্টা করে। ৩১ মিনিটে ঋতুপর্ণা চাকমার বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শট উজবেক গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দেন। ৪২ মিনিটে তহুরা খাতুনের পাস থেকে সুযোগ নষ্ট করেন ডিফেন্ডার কোহাতি কিসকু। মারিয়া মান্দার একটি চমৎকার ট্যাকল এবং গোলরক্ষক মিলি আক্তারের কয়েকটি সেভ প্রথমার্ধে ব্যবধান বাড়তে দেয়নি। বিরতির পর আক্রমণের ধার বাড়াতে সুইডেনপ্রবাসী আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীকে মাঠে নামান কোচ বাটলার। কিন্তু মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ আর ফিরে পায়নি বাংলাদেশ। ৬২ ও ৬৬ মিনিটে দিলদোরা নোজিমোভার দুটি গোলে বাংলাদেশের স্বপ্ন প্রায় শেষ হয়ে যায়। ৮২ মিনিটে উজবেকিস্তান চতুর্থ গোলটি করে। শেষ দিকে সুরভীর একটি জোরালো শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে সান্ত্বনার গোলটিও পায়নি লাল-সবুজরা। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারলে আবার সিডনিতে ফেরার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু সেই পথ আর খোলা থাকল না। তবুও এই বিদায়ের মধ্যেও একটি সত্য থেকে যায়—এশিয়ান কাপের মূল পর্বে বাংলাদেশের উপস্থিতি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। হয়তো এই টুর্নামেন্ট বড় সাফল্য এনে দেয়নি, কিন্তু এশিয়ার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড় শিক্ষা দিয়েছে। সেই শিক্ষা নিয়েই দেশে ফিরবে দল। আর হয়তো ভবিষ্যতের কোনো এক এশিয়ান কাপে এই একই মঞ্চে নতুন গল্প শুরু হবে—যেখানে স্বপ্ন ও বাস্তবতা একদিন মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন
Advertisement