কীর্তনখোলা রিপোর্ট
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। কোথাও সড়কের বিটুমিন উঠে গেছে, আবার কোথাও গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কিছু জায়গায় সড়ক বসে গেছে, আবার কিছু স্থানে ফুলে উঠেছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বড় অংশজুড়েই এমন বেহাল অবস্থা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের প্রধান সড়কপথ এটি। কিন্তু অপ্রশস্ত এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ফলে আসন্ন ঈদে এই সড়ক দিয়ে বাড়ি ফেরা যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর সেতুর পশ্চিম ঢালে একটি তিন চাকার যান (মাহেন্দ্র) নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. হারুন (৩৫)। যাত্রী খালি পেয়ে কয়েকজন ওই যানটিতে ওঠেন। চালক জানতে চান, ‘আপনারা কোথায় যাবেন?’ যাত্রীরা জানান, গৌরনদী। তখন চালক সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ‘না, গৌরনদী যামু না, রাস্তায় ঝামেলা।’ পরে চালক হারুন জানান, মাহিলারা থেকে আশুকাঠী পর্যন্ত মহাসড়কের ডান পাশে সড়ক বর্ধিতকরণের কাজ চলছে। এমনিতেই ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের এই অংশটি বেশ সরু। তার ওপর রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বর্ধিতকরণের জন্য মাটি কাটার কারণে সড়কে গর্ত তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। চালক হারুন বলেন, ‘খুব দরকার না হলে ওই পথে যাই না।’ ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে বরিশাল থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ৯৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে মাদারীপুর জেলার অংশ রয়েছে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার। মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত এই সড়কটিতে সারা বছরই অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ থাকে। গত বর্ষা মৌসুমে, বিশেষ করে গত জুলাই মাসে এ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। তখন মহাসড়কের বড় অংশজুড়ে অসংখ্য বড় গর্ত ও খানাখন্দ তৈরি হয়। বর্ষাকালে এসব গর্ত ও খানাখন্দের কারণে মহাসড়কের বরিশাল অংশে জরুরি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় বালু, পাথর ও পিচ ব্যবহার করে সাময়িকভাবে সড়ক সংস্কার করা হয়েছিল। তবে ছয় মাসও না যেতেই অনেক জায়গায় আবার আগের মতোই অবস্থা ফিরে এসেছে। বিশেষ করে বরিশালের কাশীপুর চৌমাথা থেকে বাবুগঞ্জের রহমতপুর বিমানবন্দর পর্যন্ত অংশে বড় বড় গর্ত এখন যাত্রী ও চালকদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদযাত্রা সামনে রেখে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলমান রয়েছে। এতে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। রহমতপুর, বাবুগঞ্জ উপজেলা, বরিশাল, ৭ মার্চ শনিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত মহাসড়ক ঘুরে দেখা যায়, কাশীপুর চৌমাথা থেকে বাবুগঞ্জের রহমতপুর পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও বালুর স্তূপ রয়েছে। কোথাও বিটুমিন উঠে গিয়ে নিচের ইটের সুরকি বের হয়ে আছে। বরিশাল নগরের শেষ অংশ গড়িয়ারপাড় থেকে বাবুগঞ্জ উপজেলার শিকারপুর সেতুর পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত একদল শ্রমিক মহাসড়ক বর্ধিতকরণের কাজ করছেন। কোথাও খননযন্ত্র দিয়ে মাটি তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও খনন করা অংশে বালু ফেলা হয়েছে। গৌরনদীর জয়শ্রী থেকে কাশেমাবাদ পর্যন্ত মহাসড়কের অংশেও একই ধরনের অবস্থা দেখা গেছে। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে চলাচলকারী বাসচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘বরিশালের কাশীপুর চৌমাথা থেকে বাবুগঞ্জের রহমতপুর পর্যন্ত সড়কের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। তার ওপর দুই পাশের বর্ধিতকরণের কাজের জন্য গর্ত করে রাখায় এখন রাস্তা আরও সরু হয়ে গেছে। দ্রুতগতির যানবাহন অন্য গাড়িকে অতিক্রম করার সময় মনে হয় এই বুঝি বাস খাদে পড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে খুব ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। ঈদের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।’ সড়ক ও জনপথ বিভাগের বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম জানান, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে, তার তুলনায় সড়কটি খুবই অপ্রশস্ত। তহবিল সংকটের কারণে ধাপে ধাপে সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। বর্তমানে দুটি গুচ্ছে মোট ১২ কিলোমিটার অংশে সড়ক বর্ধিতকরণের কাজ চলছে। এর একটি কাজ আগামী জুনের মধ্যে এবং অন্যটির কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব স্থানে বড় গর্ত রয়েছে, সেগুলো ঈদের আগেই মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ কারণে সাময়িকভাবে যান চলাচলে কিছু ভোগান্তি ও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে মাদারীপুরের ভুরঘাটা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সড়কে অন্তত ৪০টি আঁকাবাঁকা ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড় রয়েছে। ভুরঘাটা থেকে টেকেরহাট পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার অংশের প্রস্থ ৭ দশমিক ৩ মিটার এবং টেকেরহাট সেতু থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশে বাড়িয়ে প্রস্থ করা হয়েছে ১০ দশমিক ৯৬ মিটার। মহাসড়কের তাঁতিবাড়ি থেকে মস্তফাপুর বাসস্ট্যান্ড ও গোলচত্বরে প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশের বিভিন্ন জায়গায় বিটুমিন উঠে গিয়ে গর্ত তৈরি হয়েছে। মস্তফাপুর মিলগেট থেকে আমগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার মহাসড়কের দুই পাশ উঁচু-নিচু হয়ে রয়েছে। গর্ত ঢাকার জন্য সেখানে ইট বিছানো হয়েছে। শানেরপাড় থেকে টেকেরহাট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হওয়ায় এখনো সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙাচোরা অবস্থা রয়েছে। টেকেরহাট গোলচত্বরের আগে-পরে প্রায় ২০০ মিটার মহাসড়ক অত্যন্ত বেহাল অবস্থায় রয়েছে। এখানেও ইট বিছিয়ে কোনোমতে মেরামত করা হয়েছে। টেকেরহাট থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার অংশের বেশির ভাগ সড়ক ভালো থাকলেও বরইতলা, বাবনাতলা ও সদরদী এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কে ভাঙাচোরা ও গর্ত রয়েছে। বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী সাকুরা পরিবহনের চালক ইকবার হোসেন হাওলাদার বলেন, ‘একদিকে সড়কটি সরু, অন্যদিকে ভাঙাচোরা অবস্থা তো আছেই। এর মধ্যে আবার ভ্যান ও রিকশা অবাধে চলাচল করে। এসব কারণে মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমছে না। প্রায়ই এই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটে। সামান্য দুর্ঘটনা হলেও পুরো রাস্তা বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। ঈদযাত্রার সময় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।’ গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর অংশে গত ছয় মাসে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়ে অন্তত ১০ জন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এছাড়া এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছেন। মস্তফাপুর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন আল রশিদ বলেন, ‘ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ৪৭ কিলোমিটার অংশ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ সড়কে আগের তুলনায় যানবাহনের চাপ অনেক বেড়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে। গত ছয় মাসে মহাসড়কে ২৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং একই সময়ে ১১ জন নিহত হয়েছেন।’ সড়ক ও জনপথ বিভাগের মাদারীপুর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী শামীম হোসেন বলেন, ‘দুটি প্যাকেজে ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। ঈদযাত্রার সময় আমাদের অংশে ভোগান্তি থাকবে না বলে আশা করছি।’ তবে মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী সাবিক হাসান বলেন, ‘মস্তফাপুর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটার সড়ক মাঝে মাঝে নামমাত্র সংস্কার করা হয়। কিন্তু এই সংস্কার কোনো কাজে আসে না। সরকারের টাকা খরচ হয়, কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ কমে না। টেকেরহাট এলাকার পরিবহন ব্যবসায়ী সুমন শেখ বলেন, ‘ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত গাড়ি চালানো এখন প্রায় যুদ্ধ করার মতো অবস্থা। রাস্তা যেমন খারাপ, তেমনি সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোও বড় সমস্যা। এসব কারণে গাড়ির গতি বাড়ানো যায় না। যারা একটু দ্রুত চলে, তারা দুর্ঘটনার শিকার হয়। আমাদের দুর্ভোগ কমার কোনো লক্ষণ নেই।’