মাহমুদ ইউসুফ
অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির পটপরিবর্তনের প্রধান নাটক মঞ্চস্থ হয় পলাশির আম্রকাননে। এই যুদ্ধ নামক খেলায় আশাহত হয় নবাব সিরাজ, আর উল্লসিত হয় প্রতিপক্ষ রবার্ট ক্লাইভ ও বাবু সম্প্রদায়। পলাশির পটপরিবর্তনেই ইউরোপের ভাগ্য খুলে যায়, উদিত হয় নতুন সূর্য। আর প্রাচ্যের দুয়ারে আঘাত হানে অন্ধকারাচ্ছন্নতা। দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীনতা বিপন্ন হয় পলাশি প্রেক্ষাপটে। পলাশিপূর্বকালে বাঙলা ছিলো পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধশালী ভূখণ্ড। বিশ্বভূগোলে বাঙলা ছিলো এক স্বর্ণপিণ্ড। বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থনীতির ১০-১৫% নিয়ন্ত্রণ করত বাংলাদেশ। দিল্লি-আগ্রার সুরম্য প্রসাদ আর তাজমহলের গায়ে লেপ্টে আছে বাঙালির অর্থবিত্ত। পৃথিবীর প্রথম সুপারমল ‘চাঁদনি চক’ দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। সপ্তদশ শতকে শাহজাহান কন্যা জাহানারার অমর সৃষ্টি এ সুপারশপে রয়েছে বাঙালির হিস্যা। কলকাতা নগর গড়ে ওঠে পূর্ববঙ্গের জনগণের টাকায়।
পলাশিত্তোর ব্রিটিশ বেনিয়ারা ফুলেফেঁপে বেড়ে ওঠে। বাঙালির অর্থ পাচার হয় ব্রিটেনে। আমাদের পূর্বপূরুষদের মুদ্রায় শিল্পবিপ্লব ঘটে ইংল্যান্ডে। ভিখারি ব্রিটিশরা জাতে ওঠে আর বিত্তবান বাঙালিরা হয় ভিখারি। সোনার বাংলা রূপান্তরিত হয়ে শ্মশান বাংলায় আর বর্বর ইউরোপ হয়ে ওঠে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পণ্ডিতদের মতে, পলাশি ট্রাজেডির বিপরীতে নবাব সিরাজদৌলার শাসন স্বাভাবিক থাকলে আধুনিক শিল্পবিপ্লব হয়ত এই বাঙলাতেই ঘটত। ঢাকা-মুর্শিদাবাদ-সোনারগাঁ আজও সভ্যতার সূতিকাগার হয়েই থাকত। পলাশির বিয়োগান্তক ঘটনা বাঙালির স্বাভাবিক জীবনে ছন্দপতন ঘটায়। নির্মোহ ও নির্ঝঞ্জাট জীবনে প্রতিধ্বনিত হয় নানা প্রতিবন্ধকতা। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বয়নশিল্প মসলিনের অবসান ঘটায়। ইংরেজ ও জমিদার মিলে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে জাতি নিধনে বড় ভূমিকা রাখে। আমাদের সহায়-সম্পদ কেড়ে নিয়ে লন্ডন হয়ে ওঠে বিশ্বের অধীশ্বর।
২.
পলাশিতে স্বাধীনতা বাহিনীর পরাজয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া বাহিনী থেকে জোরালো ভূমিকা রাখে দেশীয় একটি কুচক্রীমহল। সিরাজের শাসনাবসানে এদের ভূমিকা ছিলো অধিক কার্যকর। এ সম্পর্কে পণ্ডিত অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান: “জগৎশেঠ’ মাহতাবচাঁদ ও স্বরূপচাঁদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলায় (ভারত) ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়। ব্রিটিশরা কখনোই ভারতে ‘রাজা’ হয়ে বসতে পারত না, যদি তাঁদের হাতে মিরজাফর-মানিকচাঁদ-উমিচাঁদ-‘জগৎশেঠ’-রায়দুর্লভদের মতো ‘মহান’ ব্যক্তিরা নিজেদের সঁপে না-দিত, বাংলার সঙ্গে বেইমানি বা বিশ্বাসসঘাতকতা না-করত। আর বিশ্বাসঘাতকদের নাটের গুরু ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। কৃষ্ণচন্দ্র রায় ছিলেন একজন কূটবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি, কৌশলীও। নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা যখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, ঠিক তখনই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ব্রিটিশদের সঙ্গে হাতে হাত মেলায়। তিনি ব্রিটিশদের প্রতি এতটাই আনুগত্য প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ‘কোম্পানি সরকার’ তাঁকে ‘মহারাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। পলাশির যুদ্ধের আগে পর্যন্ত বাংলায় যে সাতজন হিন্দুরাজা ছিলো, তাঁদের মধ্যে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকেই ইতিহাস মনে রেখেছে। তবে ব্রিটিশদের পক্ষে কেন যোগ দেওয়া উচিত, এটা বাকি ৬ জন হিন্দুরাজাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি তাঁদের বোঝাতে বা মনে বিষ ঢোকাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, তাঁদের হিন্দুধর্ম মুসলিম শাসকদের হাতে নিরাপদ নয়। বরং ব্রিটিশদের কাছে তাঁদের ধর্ম বেশি নিরাপদ। মির জাফরের তুলনায় ‘জগৎশেঠ’-দের বিশ্বাসঘাতকতাও কোনো অংশেই কিছু কম ছিল না। শেঠজিদের বিশাল অর্থ সাহায্যেই ইংরেজদের এমন দুঃসাহসিক অভিযান এবং শাসনের গোড়াপত্তন। উমিচাঁদ, জগৎশেঠদেরই ‘মাস্টার প্ল্যান’, লোভী মির জাফর ক্রীড়নকমাত্র। পিছন থেকে হিন্দুদের ‘শুভানুধ্যায়ী’র ছদ্মবেশে ক্লাইভরা কলকাঠি নাড়িয়েছে। শেঠজিরা শুধুমাত্র ইংরেজদের হাতে অর্থ দেননি, সিরাজের সৈন্যদের পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ সরবরাহ করে ভারতকে শৃঙ্খলবদ্ধ করেছে, ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে। কিন্তু ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস, বিশ্বাসঘাতকতার সব বিষ মির জাফরের কণ্ঠে ধারণ করতে হল !”
কলকাতার সাংবাদিক সৌপ্তিক বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন: “নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মূলে ছিলো চার হিন্দু।” তিনি বলেছেন: “এক মুসলিম নবাব প্রাণপণে চেষ্টা করলেন বাংলা বাঁচাতে। অপরদিকে হিন্দু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা ক্রমাগত সাহায্য করে গেল ইংরেজদের। ফলাফল প্রথমে ইংরেজ বাহিনীর কলকাতা দখল এবং পরে বাংলা দখল। ২ জানুয়ারি ১৭৫৭, এমন দিনেই কলকাতা পুনর্দখল করে ইংরেজরা। এরপর পলাশির যুদ্ধে কলকাতা এবং বাংলাকে পরিপূর্ণভাবে দখলে এনেছিল ব্রিটিশরা। বিশ্বাসঘাতকতার সৌজন্যে প্রভাবশালী রায়দুর্লভ মানিকচাঁদ, জগৎ শেঠ এবং উমিচাঁদ।” ঐতিহাসিক তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ষড়যন্ত্রটা আসলে হিন্দুদেরই ষড়যন্ত্র। তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়।” সেই চক্রান্তকারীদের উত্তরসূরীদের হাতে অগ্নিগর্ভ আজকের ভারত। তবে বাঙলার স¦াধীনতা ক্ষুণ্ন হয় পলাশিতে নয়। সেটা ঘটে পলাশি ট্রাজেডির ১৮০ বছর পূর্বে ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই রাজমহলের যুদ্ধে। রাজমহল ট্রাজেডি ঘটে মাহারাজা প্রতাপাদিত্যের পিতা বিক্রমাদিত্য শ্রীহরি ও চাচা শ্রী বসন্ত রায়ের চক্রান্তে। দাউদ খান কররানির শাহাদাতের মধ্য দিয়ে বাঙালি হারায় স্বাধীনতা আর দেশ নীত হয় দিল্লির বেদিমূলে। ২৩ জুন হলো দক্ষিণ এশিয়ার পরাধীনতার দিন।
৩.
২৩ জুন ১৭৫৭। রবার্ট ক্লাইভ, রাজবল্লভ, মানিক চাঁদ, কৃষ্ণদাশ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, নন্দকুমার, মিরজাফর, গোবিন্দ মিত্র, ইয়ার লতিফ, ঘষেটি বেগম ও জগৎশেঠ ভ্রাতৃদ্বয়ের কুটনীতিতে বৈরী পলাশির নিঃসঙ্গ পথিকের পরাজয় ঘটে। নবাব সিরাজদৌলা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে উপনিবেশের ধারা বদল হয়। দিল্লির ছায়া সরকারের স্থলাভিসিক্ত হয় ব্রিটেনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রুল। বাঙালির ললাটে দিল্লি সাম্রাজ্যবাদের তিলক কেটে ইংরেজ অভিশাপ ঝেঁকে বসে। অনিশ্চিত, স্থবির ও জটিল হয়ে পড়ে বাংলার অর্থনীতি ও রাজনীতি। সহস্রাব্দের বর্ধিষ্ণু জনজীবনে ঘটে ছন্দপতন। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্যে নেমে অবর্ণনীয় দুর্যোগ ও অমানিশা। শুরু হয় বিপ্লব আর বিদ্রোহের ক্রমবর্ধমান ধারা। ১৭৬৩, ১৭৬৯, ১৭৭১, ১৭৮৬, ১৭৯২, ১৮০০, ১৮৩১, ১৮৫৭, ১৯০৫। বহুরক্তক্ষয় ও জীবননাশ। অবশেষে ১৯৪৭। স্বাধীনতার পহেলা সবক। শিশির ভেজা স্নিগ্ধ ভোর।