মাহমুদ ইউসুফ

রমযান কেবল সিয়াম সাধনা ও তারাবিহ’র মাস নয়। ইহা বিজয়ের, বিপ্লবের, সত্য প্রতিষ্ঠার, মিথ্যা ও অন্ধকার দূরীকরণের মাস। প্রভাতের আলো উড্ডীনের সময়কাল এই রমযান। রমযানের মাহাত্ম্য, তাৎপর্য, গুরুত্ব সুসত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই সুনির্ধারিত। বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই রমযান। ইসলামের ইতিহাস শুরু মহানবির নবুওয়াতকে কেন্দ্র করে নয়। বরং দীনের শুরু হযরত আদমের আবির্ভাবকেন্দ্রিক। অর্থাৎ পৃথিবী নামক গ্রহে মানুষের অভিযাত্রার প্রারম্ভকাল থেকেই মুসলমানদের ঐতিহ্যযাত্রা। দুনিয়াতে সব নবিদের আগমন ঘটেছে একটি মৌলিক দায়িত্ব সম্পন্নের জন্য। রিসালাতের সেই মহান দায়িত্বটি হলো পৃথিবীর বুকে সত্য বিধান প্রতিষ্ঠা। আসমানি কিতাব ও সহিফা নাযিলের উদ্দেশ্যও তাই। হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বে হককে বিজয়ী করার অব্যাহত অভিযান পরিচালনাই নবিওয়ালাদের কাজ। সত্য পথে নিরন্তর সংগ্রাম সাধনাই ইবাদত-উপাসনা। 

ঐতিহাসিক বদরযুদ্ধ: সত্য প্রতিষ্ঠার চিরন্তন প্রেরণা

বদর প্রান্তরটি ডিম্বাকৃতির সুবিশাল এক এলাকা, যার চওড়া প্রায় সাত কিলোমিটার। স্থানটি ছিল ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্য পথের কেন্দ্রবিন্দু। মক্কা ও মদিনা থেকে আসা দুটি পথের সম্মিলন, যা এই স্থানটিকে বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্ববহ করে তোলে। লোহিত সাগরের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটি আরও বেশি কৌশলগত স্ট্রাটেজি বহন করত। স্থানটির নামকরণ ‘বদর’ করার পেছনে জনপ্রিয় মত হলো, বদর বিন ইয়াখলাদ নামে এক আরব নাগরিক এখানে একটি কূপ খনন করেন। কূপটির পানি ছিলো অত্যন্ত স্বচ্ছ; বর্ণিত আছে যে, এখানে চাঁদের প্রতিফলন দেখা যেত। তাই এই স্থানের নাম হয় ‘বদর’। আরবি ভাষায় ‘বদর’ মানে পূর্ণিমার দীপ্তিমান চাঁদ। 

সত্য বলা, সত্য পথে চলা, সত্য সাক্ষ্য দেওয়া, সত্য প্রচার, সত্য প্রকাশ, সত্য পথে অটুট থাকা, সত্য পথে আহ্বানই মানুষের মৌলিক দায়িত্ব। মিথ্যা প্রতিরোধ, মিথ্যা দূরীভূতকরণ, মিথ্যার মু-পাত, মিথ্যার মূলোৎপাটনের জন্যই নবিদের আগমন। একত্ববাদী বনাম বহুত্ববাদী, তাওহিদবাদী বনাম অংশীবাদী লড়াই চলমান। অন্যায়-অবিচারের বিপরীতে ন্যায়-ইনসাফের বিজয়, উগ্রতার বিপরীতে উদারতা, সন্ত্রাস-সহিংসতার বিপরীতে মানবতার সংরক্ষণ। পরাধীনতার বিপরীতে আযাদি, পাশবিকতার বিপরীতে প্রাণরক্ষার সংগ্রাম, আগ্রাসনের বিপরীতে আত্মরক্ষার অবিচল সংগ্রামই ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। 

বদরের সংগ্রাম সত্য সুসংহতকরণের শাশ্বত স্মারক। পবিত্র রমযান মাসে সংঘটিত হয় এই রোমাঞ্চকর বদরযুদ্ধ, যেখানে সত্য বিজয় অর্জন করে, মিথ্যা পরাভূত হয়। তাওহিদের উত্থান বেগবান হয় আর পৌত্তলিকতার আকাশে মেঘের বলিরেখা সম্প্রসারিত হয়। সময়কাল ১৭ রমযান, ৬২৫ ইসায়ি। হিজরতের তৃতীয়বর্ষে। মদিনাকেন্দ্রিক একটি নবীন রাষ্ট্রের বিলোপ সাধনে মক্কার কুরাইশরা সেদিন বদরপ্রান্তরে সমবেত হয়েছিল। ফলাফল সবার জানা। কুরাইশদের পরাজয়ে মক্কাবাসীরা ছিলো হতবাক, মুহ্যমান। কিন্তু মদিনার এই নবশক্তির আবির্ভাব যে অচিরেই প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ভূগোলে ঝড় তুলবে তামাম দুনিয়ার রাষ্ট্রশক্তিগুলো সমকালে বুঝতে পারে নাই। আজ ১৭ রমযান ২০২৬। ঐতিহাসিক বদর দিবসের ১৪০১ তম বার্ষিকী। 

আল কুরআনের বিবৃতি: মহানবি মুহাম্মাদকে প্রেরণ করা হয়েছে সত্য জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠার জন্য। (৯:৩৩, ৬১:৯) এই সুসত্য কায়েমের জন্যেই মহানবি ২৩ বছরের নবুওয়াতি জিন্দেগিতে ৮৬টি যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য হয়। তবে সিংহভাগই ছিলো আত্মরক্ষামূলক, আক্রমণাত্মক নয়। প্রতিপক্ষের আগ্রাসন মোকাবেলা করতে তাঁকে যুদ্ধাভিজানে অগ্রসর হতে হয় বারবার। তাঁর প্রথম সম্মুখসমর ছিলো ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। একটি ক্ষুদ্র দুর্বল বাহিনী সেদিন শক্তিশালী বাহিনীর বিপরীতে অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করে। এই সফলতা কুরাইশদের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার  ক্ষেত্রে মুসলিম প্রাণশক্তিকে উজ্জীবিত করে। এই দিনকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ অর্থাৎ ‘সিদ্ধান্তের দিন বা সত্য-অসত্যের পার্থক্যকারী’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। বদরের ঘটনা একটি যুদ্ধমাত্র ছিলো না, এটি ছিলো মদিনার তাওহিদি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মাইলফলক।

মহানবি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের নিপুণ যুদ্ধকৌশল, প্রজ্ঞা, শৃঙ্খলা, আনুগত্য, আদর্শের স্থিরকরণ, দৃঢ় বিশ্বাস, সচ্চরিত্রের নিকট তদানীন্তন পরাশক্তিগুলোর পরাজয় ঘটে। বাঙালি জাতিও মহানবি এবং সাহাবিদের চেতনাদর্শে উজ্জীবিত। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ইমান, আকাইদ, তাওহিদ, রিসালাতের ধারাবাহী এবং ইহ-পারলৌকিক শান্তি-মুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত। তাই বদর দিবস ও বদর যুদ্ধের বিজয়গাঁথা আজও বাঙালির অনুপ্রেরণা। ২০২৪ সালের জুলাই রেভ্যুলেশন ছিলো বদরেই প্রতিধ্বনি। 

সিরিয়ান-আমেরিকান চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক মুস্তফা আক্কাদ পরিচালিত ‘দ্য মেসেজ’ চলচ্চিত্রে বদরের যুদ্ধের ঘটনাবলির দৃশ্যায়নের জীবন্তরূপ চিরায়ত সংস্কৃতিরই অংশ। ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ফিল্মটির চিত্রনাট্য ছিলেন এইচ.এ.এল. ক্রেইজ। রিচার্ড রিচ পরিচালিত ‘মুহাম্মদ: দ্য লাস্ট প্রফেট’ বিখ্যাত কুরানিক মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র। অ্যানিমেশনকৃত ছবিটি ২০০২ সালে মুক্তি পায়। ২০১২ সালে হাতিম আলি পরিচালিত আরব বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও উচুঁমানের টিভি শিল্পকর্ম ‘উমর’ ধারাবাহিক দর্শকনন্দিত। এই দুটি সংস্কৃতিকর্মেও বদরযুদ্ধের স্মৃতি চিরভাস্মর। বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তি নাট্যকর্ম ড. আসকার ইবনে শাইখও মহানবির জীবনের চুম্বক অংশ বিভিন্ন নাট্যকর্মে তুলে ধরেছেন অতি মুন্সিয়ানার সঙ্গে।

পবিত্র রমযান মাসে সংঘটিত ইসলামের ইতিহাসের আরও কতিপয় ঘটনা:

১. নবি আদমের তওবা গ্রহণ: মহান আল্লহর দরবারে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম আলাইহিস সালামের তওবা কবুল হওয়ার ঘটনা ঘটে এই রমযান মাসে। 

২. মহাপ্লাবন থেকে নবি নুহ’র পরিত্রান: আল্লহর নবি হযরত নুহ আ. মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পেতে স্বনির্মিত জাহাজে অনুসারী মুসলমাদের নিয়ে আরোহণ করেন। ঝড়-তুফান থেকে জাহাজ তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল জুদি পাহাড়ে থেমে যায়। তিনি রমযান মাসেই সেই প্লাবন থেকে রক্ষা পান। (রমযান, ৫০০০ খ্রিস্টপূর্ব)

৩. নবি ইবরহিমের নবুওয়াত: রমযান মাসে জাতির পিতা ইবরহিম আ. আল্লহর পক্ষ থেকে সহিফা লাভ করেন। (০১ রমযান, ১৮৬০ খ্রিস্টপূর্ব) নমরুদ সৃষ্ট অগ্নিকু- থেকেও পরিত্রান লাভ করেন রমযান মাসে। 

৪. নবি মুসার নবুওয়াত: রমযান মাসেই ইসলামের নবি মুসা আ. তাওরাত লাভ করে আসমানি আলোয় উদ্ভাসিত হন। (০৬ রমযান, ১৩৫২ খ্রিস্টপূর্ব) ফারাও স¤্রাটের (রামেসিস বা মারনেপতাহ) হিংস্রতা থেকে মুসা আ. মুসলমানদের মুক্ত করেছিলেনও এই রমযান মাসে। হযরত মুসার মৃত্যু: (২১ রমযান ১২৭২ খ্রিস্টপূর্ব)

৫. নবি দাউদের নবুওয়াত: হজরত দাউদ আ.-এর ওপর আসমানি আলোকমালা জাবুর কিতাব নাযিল হয়। (১৮ রমজান, ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব) অত্যাচারী সেনাধ্যক্ষ জালুতের বিরুদ্ধে দাউদ আ. এর মুসলিম বাহিনী বিজয়লাভও করেছিলেন এই রমযান মাসে। 

৬. নবি ইউনুসের পরিত্রান: ইসলামের নবি হযরত ইউনুস আ. রমযান মাসে মৎস্যগ্রাস থেকে মুক্ত হন। (রমযান, খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী)

৭. নবি ইসার নবুওয়াত: রমযান মাসে ইসা আলাইহিস সালামের ওপর ইঞ্জিল (বাইবেল) কিতাবের আলোকরশ্মি অবতীর্ণ হয়। (১৩ রমযান, ৩০ ইসায়ি) 

৮. ইসলামের নবি ইসা আলাইহিস সালামকে (যিশুখ্রিস্ট) আসমানে উত্তোলন: (২১ রমযান, ৩৩ ইসায়ি)

৯. আল কুরআন অবতীর্ণ: একালে চলমান একমাত্র নির্ভুল ও সত্যগ্রন্ত আল-কুরআন রমযান মাসেই নাযিল হয়। প্রথম বাক্য: ইকর বিসমি রব্বি কাল্লাজি খলাক (২৭ রমযান, ৬১০ ইসায়ি) আল কুরআন হলো সত্য ও হকের প্রতীক। বাঙালির দুর্ভাগ্য যে, এই সত্যের একাডেমিওয়ান নেই তাদের পাঠ্যক্রমে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অহির শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিককরণ হলেই ছাত্র ও পতি সমাজ আসমানি আলোর দীক্ষা পাবেন। আল কুরআন, আল হাদিস, সিরাত, কুরানিক সায়েন্স, কুরানিক আর্কিওলজি-সমাজতত্ত্ব-রাষ্ট্রতত্ত্ব-ভূতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়াবলি একাডেমিক পাঠ্যভুক্ত হলে রাষ্ট্র ও সমাজ সংস্কারে অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হবে। 

১০. মহানবির নবুওয়াত লাভ: কুরআন নাযিলের মাধ্যমেই মহানবি প্রথম অহি লাভ করেন এবং নবুওয়াত প্রাপ্ত হন। (২৭ রমযান, ৬১০ ইসায়ি)

১১. সিইফুল বাহার অভিযান: মহানবির বিজয়ের ধারাবাহিকতা শুরু হয় রমযান মাস দিয়েই। গধশশধ ঞড় গধফরহধ (মক্কা থেকে মদিনা) হিজরতের পর হামজা ইবন আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে ৩০জন সাহাবার সমন্বয় ‘সিইফুল বাহার’ অভিযানে মুজাহিদরা সফলতা অর্জন করেন। এ অভিযানের ফলে দীনের চিরশত্রু আবু জাহলদের মনে ভীতির সঞ্চার হয়। (০৪ রমযান ৬২৩ ইসায়ি)

১২. মক্কা অভিযান: রমযান মাসেই সত্যপন্থী সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণভাবে মক্কা বিজয় করে। মক্কা বিজয় সম্পন্ন হলে নবিজি স.  কাবার অভ্যন্তরের সব ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেন। এভাবে মক্কাকে পৌত্তিলকতা মুক্ত করা হয় এবং একচ্ছত্র আল্লাহর দাসত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। (২০ রমযান, ৬২৯ ইসায়ি)

১৩. তায়েফ বিজয়: মহানবি স. তায়েফ শহর জয়লাভ করেন। (২২ রমযান, ৬৩০ ইসায়ি)

১৪. তাবুক অভিযান: রমযান মাসে সংঘটিত হয় এই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান। তাবুক মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি স্থান। মদিনা থেকে ৬৯০ কিলোমিটার দূরে। এ যুদ্ধ ছিলো ইসলামের বিরুদ্ধে আরবের কাফির ও মুনাফিকদের শেষ চেষ্টা। তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রোমান ও পথভ্রষ্ট অ্যারাবিয়ানদের সমন্বয়ে সংঘবদ্ধ যৌথ বাহিনীর রণপ্রস্তুতিই এ জিহাদের মূল কারণ। (০৮-২৬ রমযান, ৬৩০ ইসায়ি)

১৫. ‘লাত’ মূর্তির মূলোৎপাটন: নবিজির নির্দেশে আরবের বিখ্যাত ‘লাত’ ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়। (২৩ রমযান ৬৩১ ইসায়ি) উজ্জার মূর্তি অপসারণ: খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্যবাহিনী নাখলার বৃহদাকার মূর্তি উজ্জার বিলোপ সাধন করা হয়। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ নিজ হাতে ওই প্রতিকৃতি অপসারণ করেন। এরপর তিনি ঘোষণা দেন: আর কখনো এখানে উজ্জার উপাসনা হবে না।’ (২৫ রমজান, ৬৩১ ইসায়ি)

১৬. সাকিফ গোত্রের সুপথ গ্রহণ: তায়েফের সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিদল মদিনায় এসে রসুলের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের আগমনে মহানবি তাঁদেরকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানান এবং তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন। মহানবি আবু সুফিয়ান ইবন হরব ও মুগিরা ইবন শু‘বা রা. কে পাঠিয়ে তাদের ভ্রান্ত মূর্তি-প্রতিমা-ভাস্কর্যকে ভেঙ্গে ফেলেন। (২৮ রমযান, ৬৩১ ইসায়ি)

১৭. বুওয়াইবের যুদ্ধ : খলিফা আবু বকর রা. এর সেনাপতি মুসান্না বিন হারিসা (রা.) ১৩ হিজরির রমযান মাসে ইরাক সীমান্তে অভিযান পরিচালনা করেন। পারস্য সেনাপতি মেহরানের নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী ইরাক সীমান্তে প্রেরণ করেন। রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মদিনার বাহিনী পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করে। এভাবেই মুসান্না ইরাক ও ইরান বিজয়ের পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। (রমযান, ৬৩৫ ইসায়ি)

১৮. বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়: খলিফা উমার রা. ফিলিস্তিনে আগমন করেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় করেন। (১৩ রমযান, ৬৩৬ ইসায়ি) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর ফারুক’ কবিতা এ ঘটনারই জয়গান।

১৯. কাদেসিয়া যুদ্ধ: সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমান ও রুস্তুম ফাররাখজাদের নেতৃত্বে পারসিকদের মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে সর্বসাকুল্যে ৩৬ হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ সুসজ্জিত পারসিক বাহিনীকে পরাজিত করে। (রমজান, ১৫ হিজরি)

২০. হাসান ইবন আলির খিলাফত লাভ: (১৮ রমযান ৬৬১ ইসায়ি) 

২১. কায়রোয়ান শহরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন: উকবা ইবন আমেরের নেতৃত্বে তিউনিসিয়ার ঐতিহাসিক কায়রোয়ান শহরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। (০২ রমযান, ৬৭০ ইসায়ি)

২২. সিন্ধু (উত্তর ভারত) অভিযান: রমযান মাসে সত্যের সেনানি জেনারেল মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধু উপত্যাকায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের ভিত্তি রচনা করেন। ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ জেনারেলের নিকট খলনায়ক রাজা দাহিরের সেনাবাহিনী বিপর্যস্ত হয়। (০৬ রমযান, ৭১১ ইসায়ি) আকবর উদ্দীনের ১৯৩০ সালে রচিত ‘সিন্ধু বিজয়’ নাটক এবং ১৯৫৮ সালে ‘মুহাম্মাদ বিন কাসিম’ নামে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মিত হয় এ বিজয়গাঁথা নিয়ে।

২৩. স্পেনে তাওহিদের বিজয় পতাকা: সিংহপুরুষ তরুণ জেনারেল তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে ইউরোপের তৎকালীন প্রাণকেন্দ্র স্পেন বিজয় লাভ করেন। তারেক ইবন জিয়াদের মাত্র ১২ হাজার সৈন্য সেদিন স্পেনের সম্রাট লুজলাইকের লক্ষাধিক  সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন। (২৮ রমযান ৭১২ ইসায়ি) অধ্যাপক আসকার ইবনে শাইখের বিখ্যাত নাটক ‘কর্ডোভার আগে’ এই বিজয়-বিপ্লবের ছায়ামাত্র।

২৪. আব্বাসি খিলাফাতের গোড়াপত্তন: আবুল আব্বাস আবদুল্লাহর খিলাফতে আরোহণের মাধ্যমে আব্বাসি খিলাফতের  গোড়াপত্তন হয় এবং উমাইয়া শাসনের অবসান ঘটে। (০২ রমযান, ৭৫০ ইসায়ি)

২৫. সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ বিজয়: যিয়াদ ইবন আগলাবের নেতৃত্বে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ জয় করেন এবং সেখানে অহির দীনের নিশান উড়ান। (০৯ রমযান, ৮২৭ ইসায়ি)

২৬. আমুরিয়া বিজয়: খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর শাসনামলে আমুরিয়ায় সফল বিজয় অভিযান পরিচালনা করেন মুজাহিদরা। উল্লেখ্য, রোমান সম্রাট টিউপিল আমুরিয়ার ঝাবতারা দুর্গে (তুরস্ক) আক্রমণ করে, যা তৎকালীন আব্বাসীয় খেলাফতের অধীন ছিল। দুর্গ দখলের পর টিউপিল বাহিনী নারী, শিশু, বৃদ্ধা নির্বিশেষে গণহত্যা চালায় এবং নারীদের বন্দি ও সম্ভ্রমহানি করে। (৬ রমযান ৮৩৮ ইসায়ি)

২৭. আল-আযহার দীনিকেন্দ্র উদ্বোধন: মিসরের ঐতিহাসিক আল-আযহার মসজিদ সালাত ও অহির ইলমের বিকাশের জন্য উদ্বোধন করা হয়। (০৭ রমযান, ৯৭১ ইসায়ী)

২৮. আসকালান শহরে অভিযান: সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডারদের আক্রমণ প্রতিহত করতে আসকালান শহর দখল করেন, যাতে সেখানে পুনরায় ক্রসেডাররা বসতি স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। (০২ রমযান, ১১৯১ ইসায়ি)

২৯. ক্রুসেডারদের প্রতিরোধ যুদ্ধ: সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু করেন। (১০ রমজান, ১৩৯৩) বিখ্যাত বাংলা নাটক ‘এক সিংহের জাগরণ’ সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের প্রথম নায়ক সালাহউদ্দিন ইউসুফ আইয়ুবি’র জীবনালেখ্যভিত্তিক শিল্পকর্ম।

৩০. বাবা আদম শাহ’র সংগ্রাম: রাজা বল্লাল সেন ও আদম শাহ’র যুদ্ধ সংঘটিত- বিক্রমপুর, মুন্সিগঞ্জ। (রমযান, ১১৭৮ ইসায়ি) এক সময়ের সাড়া জাগানো টিভি নাট্যসিরিজ ‘রক্তগোলাপ’ এ ট্রাজেডির আলেখ্য।

৩১. বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়: রমযান মাসেই ইতিহাসের শ্রেষ্ঠবীরদের অন্যতম জেনারেল বখতিয়ার খলজি বাংলায় রাজনৈতিক রেনেসাঁর সূত্রপাত করেন। মাত্র ১৭ জন সৈন্য নিয়ে তিনি বাঙলা অধিকার করেন। বঙ্গাধিপতি লক্ষ্মণ সেন পশ্চাতদ্বার দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। (১৯ রমযান, ১২০৫) কথাসাহিত্যিক শফীউদ্দীন সরদার রচিত উপন্যাস ‘বখতিয়ারের তলোয়ার’ ও আল মাহমুদ রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ বাংলা সাহিত্যের অমর কীর্তি।

৩২. আইন জালুত বিজয়: মিসরের আমির সাইফুদ্দিন কুতযের নেতৃত্বে হালাকু খানের শাম দেশীয় তাতার সেনাপতি কাতবাগানুইনকে পরাজিত করে ‘আইনে জালুত বিজয় লাভ করেন। হালাকু খানের বর্বর ধ্বংসযাত্রা অতঃপর ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে। (জুমাবার, ২৫ রমযান ৬৫৮ হিজরি)

৩৩. শাহজালালের সংগ্রাম: সিলেটে সামাজিক নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল এই রমযানে। হযরত শাহজালাল, নাসির উদ্দিন ও গৌড় গোবিন্দের মধ্যে সংঘটিত হয় বিপ্লবের লড়াই। (রমযান, ১৩০৩)

৩৪. বাঙালির নেপাল জয়: দ্বিতীয় আলেকজান্ডার নামে খ্যাত বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক হাজি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নেপালে অভিযান পরিচালনা করেন এই মাসেই। (রমযান, ১৩৫০ ইসায়ি)

৩৫. কনস্টান্টিনোপল বিজয়: সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ’র নেতৃত্বে উসমানীয়রা বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় করেন। (রমযান, ১৪৫৩ ইসায়ি) এই বিজয়ের মাধ্যমে উসমানীয়রা বিশ্ব ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনা করেন।

৩৬. বেলগ্রেড অভিযান: সুলতান সুলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট রমযান মাসে বেলগ্রেড জয় করেন, যা ইউরোপে উসমানীয়দের অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। (রমযান, ১৫২১ ইসায়ি)

৩৭. রোডস দ্বীপ বিজয়: রমযান মাসে উসমানীয়রা রোডস দ্বীপ জয় করে, যার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে তাদের নৌ-শক্তি আরও সুদৃঢ় হয়। (রমযান, ১৫২২ ইসায়ি)

৩৮. জার্মান অভিযান: সপ্তদশ শতকে উসমানি শাসনামলে তুর্কি ও জার্মান বাহিনীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হাঙ্গেরি ও দানিউব অঞ্চল ছিলো এ যুদ্ধস্পট। (২৭ রমযান, ১৬৯৬ ইসায়ি)

৩৯. রুশ অভিযান: উনিশ শতকের এই রমযানেরই এক যুদ্ধে উসমানি সাম্রাজ্য (রুশ-তুর্কি যুদ্ধ) রাশিয়ার দুর্ধর্ষ বাহিনীর ওপর জয়লাভ করে। এটি তাতারিৎসার যুদ্ধ নামে পরিচিত। স্থান: বর্তমান বুলগেরিয়া।  (১৫ রমযান, ১৮০৯ ইসায়ি)

৪০. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম: আঠারোশ সাতান্ন সালের বাংলা-ভারতের প্রথম মহাবিদ্রোহের ঘটনা শুরু হয় রমযান মাসে। (রমযান, ১৮৫৭ ইসায়ি) ‘রক্তপদ্ম’ ও ‘এমন এক বকরীদে’ সাতান্ন’র স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর অসাধারণ বাংলা নাট্যকর্ম।


বিজ্ঞাপন
Advertisement